ঠিক-বেঠিক মার্কেটি ২
ঠিক-বেঠিক মার্কেটি ২
By (author) গালীব বিন মোহাম্মদ
মার্কেটিং— মানব মনের গভীর আবেগ ও অনুভূতি, ভালো লাগা-খারাপ লাগা, চাহিদা-অপূর্ণতা-তৃপ্তি নিয়ে কাজ করা অসাধারণ এক বিষয়। আধুনিক পৃথিবীর প্রতিটি ব্যাবসাপ্রতিষ্ঠানের কেন্দ্রে থেকে মার্কেটিং কাজ করে ভোক্তার অপূর্ণ চাহিদা বের করে আনা থেকে শুরু করে তাকে সফল ও প্রতিষ্ঠানের জন্য লাভজনকভাবে পূর্ণ করা পর্যন্ত। ব্যাবসার ভাষায় বললে পুরো ভ্যালু চেইন নিয়ে। জটিল, সময়সাপেক্ষ, প্রচণ্ড বুদ্ধির মারপ্যাঁচের এ কাজ কিন্তু মোটেও সোজা নয়; বরং পদে পদে মার্কেটিয়ারদের পড়তে হয় নানান চাপে— বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ দুভাবেই। ফলে হয় নানান ভুল-ভ্রান্তি। এড়িয়ে যায় অনেক বিষয়, যা হয়তো সাময়িকভাবে ঠিক মনে হলেও দিনশেষে ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
এ বইটিতে সে রকম কিছু ঘটনাই বলা হয়েছে, যার প্রতিটিই বাংলাদেশের মার্কেটিং দুনিয়ায় ঘটে যাওয়া পর্যবেক্ষণ থেকে লেখা।
এ দেশে দেশীয় মার্কেটিং কেস স্টাডি বা পর্যবেক্ষণ নিয়ে বাংলায় তেমন কোনো প্রফেশনাল বই নেই। সে ক্ষেত্রে এ বইটিকে নতুন একটি পদক্ষেপ বলাই যায়।
ডমরু-চরিত
ডমরু-চরিত
By (author) ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়
অত্যন্ত হাস্যরসিক চরিত্র ডমরুধর। ডমরুধরের নানান কীর্তি, অ্যাডভেঞ্চার, রূপকথা, রম্য এবং সামাজিক বিভিন্ন কাহিনি নিয়েই ডমরু-চরিত। প্রথম জীবনে বেশ দরিদ্র ছিল ডমরুধর, তারপর বুদ্ধি খাটিয়ে কীভাবে ধনার্জন করেছে, দুর্গোৎসবের সময় তার ঠাকুর দালানে বসে সেইসব গল্প করে বন্ধুদের সঙ্গে। সবাই আজগুবি গল্প বলে টিপ্পনী কাটে কিন্তু ডমরুধর দমে যাওয়ার পাত্র নয়। তার গল্পে কখনো সে যমালয়ে ভ্রমন করেছে, কখনো আবার কার্তিক বহনে চড়ে ত্রিভুবন দর্শন করেছে। এ ছাড়াও ভণ্ড সাধু, ভালোমানুষ ভূত, বোগদাদি জ্বিন, সুন্দরবনের বাঘ ইত্যাদির গল্প চলে আসে তার আড্ডায়।
ডমরু-চরিত-এর আনন্দময় পাঠ শিশু-কিশোরদের কল্পনার দুনিয়াকে সমৃদ্ধ করে আসছে প্রায় এক শ বছর ধরে। পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি বাংলা সাহিত্যের কালজয়ী এ রম্য রচনা নতুন প্রজন্মের জন্য অবশ্য পাঠ্য।
ডিজিটাল ঈশপের গল্প
ডিজিটাল ঈশপের গল্প
By (author) সঞ্জয় মুখার্জী
মহামতি ঈশপের খরগোশ ও কচ্ছপের গল্পের কথা মনে আছে? কেমন হতো যদি এই ডিজিটাল যুগে দৌড় প্রতিযোগিতার জন্য এরা পায়ের উপর নির্ভর না করে প্রাইভেট কার বা মেট্রোরেলের সাহায্য নিত? কিংবা সেই তৃষ্ণার্ত কাকটি যদি কলসিতে পাথর ফেলে পানি পান করার চেষ্টার পরিবর্তে মিনারেল ওয়াটারের বোতল কিনে তৃষ্ণা মেটাবার চেষ্টা করত? এই বইতে ঈশপের গল্পের চরিত্রগুলোকে নিয়ে এমন সব আজগুবি কল্পনাই করা হয়েছে। ঈশপের জনপ্রিয় ত্রিশটি গল্পকে ডিজিটাল যুগের নানা সুবিধা, অসুবিধা ও অসংগতির প্রেক্ষাপটে উপস্থাপন করা হয়েছে রসাত্মক রম্যরচনার ভঙ্গিমায়। গল্পগুলো সব বয়সী পাঠকের জন্যই লঘু বিনোদনের পাশাপাশি ডিজিটাল যুগের সমস্যা ও সম্ভাবনা নিয়ে ভাবনার খোরাক যোগাবে বলে আশা করা যায়।
ডিজিটাল কর্তৃত্ববাদ, নজরদারি পুঁজিবাদ ও মানুষের স্বাধীন ইচ্ছার ভবিষ্যৎ
ডিজিটাল কর্তৃত্ববাদ, নজরদারি পুঁজিবাদ ও মানুষের স্বাধীন ইচ্ছার ভবিষ্যৎ
By (author) কল্লোল মোস্তফা
ইন্টারনেট ও ডিজিটাল প্রযুক্তিকে কেন্দ্র করে নতুন ধরনের কর্তৃত্ববাদী ও নজরদারি পুঁজিবাদী তৎপরতার বিকাশ ঘটছে। তথ্য প্রবাহের উপর সরকারি নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি এখন কেবল কোনো কিছু ব্লক বা বন্ধ করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; ইন্টারনেট মাধ্যমের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যকে কাজে লাগিয়ে জনগণের চিন্তার উপর নিয়ন্ত্রণ কায়েমের জন্য পরিকল্পিতভাবে জনগণকে নানান অগুরুত্বপুর্ণ বিষয়ে ব্যস্ত রাখা, সরকারি বক্তব্য বা অবস্থানকে নিরপেক্ষ মতামত বা সংবাদ হিসেবে প্রচার করা, ভাড়াটে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের আলোচনার বিষয়বস্তু নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদি বহুরকম তৎপরতা চালানো হয়। অন্যদিকে, সরকারি কর্তৃত্ববাদী প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমভিত্তিক গ্লোবাল কর্পোরেশনগুলোর জন্ম ও বিকাশ, সেগুলো আবার ডিজিটাল সেবার বিনিময়ে কোটি কোটি ব্যবহারকারীর তথ্য অবাধে সংগ্রহ করা এবং সেই তথ্যকে মানুষের আচার-আচরণ অনুমান ও প্রভাবিত করার কারবারে লিপ্ত। কাজেই স্বাধীন চিন্তা ও তৎপরতার জায়গা থেকে সরকারি কর্তৃত্ববাদ আর বহুজাতিক নজরদারি পুঁজিবাদ— উভয় প্রপঞ্চের সাথেই বোঝাপড়া ও মোকাবিলা করা জরুরি। বাংলাদেশের অনলাইন অ্যাক্টিভিজম, রাজনৈতিক পরিমণ্ডল ও বিদ্যায়তনিক জগতে ডিজিটাল কর্তৃত্ববাদ ও নজরদারি পুঁজির সাম্প্রতিক এসব প্রবণতা নিয়ে বোঝাপড়ায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে এই অনুবাদ সংকলনটি।
তত্ত্বতালাশ
তত্ত্বতালাশ
By (author) মোহাম্মদ আজম
তত্ত্বতালাশ প্রথম সংখ্যা প্রকাশিত হল জুলাই ২০২১ সংখ্যা হিসাবে। ত্রৈমাসিক হিসাবে পরের সংখ্যা আমরা এ বছরের অক্টোবরেই প্রকাশের পরিকল্পনা করছি। আমাদের প্রস্তুতি থাকা সত্ত্বেও করোনা-পরিস্থিতি, লকডাউন ইত্যাদির কারণে প্রথম সংখ্যার প্রকাশ একটু দেরিতে হল। আমাদের আহ্বানে বেশ দ্রুততার সাথে লেখা দিয়েছেন এ সংখ্যার প্রাবন্ধিকেরা। দুটি লেখা অবশ্য আমাদের হাতে এসে পৌঁছেছে একটু ঘুর-পথে। পরে লেখকদের অনুমতি নিয়েছি আমরা। যাঁরা আমাদের আহ্বানে লেখার শ্রম স্বীকার করলেন, আর যাঁরা লেখা প্রকাশের অনুমতি দিলেন, সবাইকে আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। সংখ্যাটি বের করতে আমরা খানিকটা তড়িঘড়ি করেছি মুখ্যত আমাদের আকাঙ্ক্ষা সম্পর্কে একটা আন্দাজ লেখক-পাঠকদের দেয়ার জন্য। পত্রিকার বিষয় ও বিন্যাসে বিশেষ কোনো পরিকল্পনা কাজ করে নাই। আশা করি, সংখ্যাটি সার্বিক যোগাযোগ স্থাপনে আমাদের সাহায্য করবে। বলা যায়, প্রবন্ধের একটা কাগজ বের করার পেছনে দুটি দিক প্রধান ভিত্তি হিসাবে কাজ করেছে। এক. গত দু্-দশকে বাংলাদেশের তুলনামূলক কম-বয়সী লেখকদের মধ্যে জ্ঞানতত্ত্ব ও পদ্ধতির দিক থেকে চিন্তার নতুন নানা ইশারা দেখা যাচ্ছে। তার অন্তত কিছু অংশকে পত্রিকার আকারে মূর্ত করা। দুই. সামাজিক যোগাযোগ-মাধ্যম ও অনলাইন প্রকাশ-মাধ্যমে চিন্তা ও তৎপরতার যেসব রোশনাই দেখা যাচ্ছে, তার অন্তত একটা অংশকে প্রবন্ধের তুলনামূলক দায়িত্বশীল আঙ্গিকে অনুবাদের চেষ্টা। নিদেনপক্ষে কলা ও সমাজবিজ্ঞানের, এবং সম্ভব হলে বাণিজ্য আর বিজ্ঞানেরও, তত্ত্ব ও প্রণালি-পদ্ধতি বাংলায় সম্ভবপর করা আমাদের অন্যতম লক্ষ্য। দেশ-দুনিয়ার চালু ভাবসকল তো আছেই। প্রাথমিকভাবে অন্তত চার সংখ্যায় আমরা বিষয়গত কোনো পরিকল্পনা করতে চাই না। এ সংখ্যাগুলোতে লেখক ও পাঠকদের সাথে যথেষ্ট খায়-খাতির হলে কিছু দূরবর্তী ও উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা নেয়া যেতে পারে। আর আমাদের যাবতীয় সাধ্য-সাধনা সত্ত্বেও লেখক-পাঠক তরফে যদি সাড়া না মেলে, তাহলে ধরে নেব, এ ধরনের পত্রিকার কোনো সামাজিক চাহিদা নাই। তত্ত্বতালাশের প্রকাশ ও বিপণনের দায়িত্ব নিয়েছেন কবি-প্রকাশক মাহবুবুর রহমান, আদর্শ প্রকাশনীর পক্ষে। লেখক-সম্মানীসহ অপরাপর খরচের দায়িত্ব নিতে আগ্রহী হয়েছেন তরুণ বিদ্যোৎসাহী মোস্তাফিজুর রহমান। তাদের ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাই। ধন্যবাদ জানাই সম্ভাব্য পাঠকদেরও, বিশেষত সক্রিয় পাঠকদের। প্রকাশিত লেখার ব্যাপারে পাঠকের পর্যালোচনা ও ভিন্নমত প্রত্যাশা করছি।
তত্ত্বতালাশ – ২ (দ্বিতীয় সংখ্যা, অক্টোবর ২০২১)
তত্ত্বতালাশ – ২ (দ্বিতীয় সংখ্যা, অক্টোবর ২০২১)
By (author) মোহাম্মদ আজম
তত্ত্বতালাশ দ্বিতীয় সংখ্যা সময়মতো প্রকাশিত হল। এজন্য এ সংখ্যার প্রাবন্ধিকদের ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। প্রথম সংখ্যার মতো এ সংখ্যায়ও কলা এবং সমাজবিদ্যার তুলনামূলক ‘সাহিত্য’ধর্মী অংশেরই প্রাধান্য বজায় থাকল। গণিত ও আইন-বিষয়ক দুটি প্রবন্ধ বিষয়-পরিধিকে খানিকটা প্রসারিত করেছে। এ ধরনের বিষয়গত প্রসারই আমাদের লক্ষ্য।
ওয়াল্টার বেনজামিন ‘যান্ত্রিক পুনরুৎপাদনের যুগে শিল্পকলা’ প্রবন্ধে প্রসঙ্গক্রমে লিখেছেন, বইয়ের উৎপাদক ও ভোক্তার মধ্যে এককালে আসমান-জমিন তফাত ছিল। কেউ কেউ ছিল উৎপাদক, আর বাকিরা শুধুই ভোক্তা। কিন্তু আধুনিক জমানায় এ অবস্থার বৈপ্লবিক বদল ঘটে। শুরুতে সংবাদপত্রের পাঠক-কলামে যে-কেউ লেখক হিসাবে আবির্ভূত হওয়ার মওকা পায়। আর পরে, ইউরোপে বিশ্ববিদ্যালয় ও পেশাদারত্ব বিকশিত হওয়ার প্রেক্ষাপটে মোটামুটি দায়িত্বশীল কাজে নিয়োজিত যে-কারো গুরুত্বপূর্ণ লেখক হিসাবে আত্মপ্রকাশ করার সুযোগ তৈরি হয়। বিভিন্ন ডিসিপ্লিন ও পেশা সম্পর্কে জরুরি বহু বই লিখেছেন এমন ব্যক্তিরা, যাদের আলাদা করে লেখক হওয়ার অনুশীলন ও ইচ্ছা ছিল না। আর এভাবে লেখক-পাঠকের পূর্বতন অধীনতামূলক সম্পর্কের মধ্যে বিরাট পরিবর্তন আসে। তত্ত্বতালাশ দ্বিতীয় সংখ্যা সময়মতো প্রকাশিত হল। এজন্য এ সংখ্যার প্রাবন্ধিকদের ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। প্রথম সংখ্যার মতো এ সংখ্যায়ও কলা এবং সমাজবিদ্যার তুলনামূলক ‘সাহিত্য’ধর্মী অংশেরই প্রাধান্য বজায় থাকল। গণিত ও আইন-বিষয়ক দুটি প্রবন্ধ বিষয়-পরিধিকে খানিকটা প্রসারিত করেছে। এ ধরনের বিষয়গত প্রসারই আমাদের লক্ষ্য।
ওয়াল্টার বেনজামিন ‘যান্ত্রিক পুনরুৎপাদনের যুগে শিল্পকলা’ প্রবন্ধে প্রসঙ্গক্রমে লিখেছেন, বইয়ের উৎপাদক ও ভোক্তার মধ্যে এককালে আসমান-জমিন তফাত ছিল। কেউ কেউ ছিল উৎপাদক, আর বাকিরা শুধুই ভোক্তা। কিন্তু আধুনিক জমানায় এ অবস্থার বৈপ্লবিক বদল ঘটে। শুরুতে সংবাদপত্রের পাঠক-কলামে যে-কেউ লেখক হিসাবে আবির্ভূত হওয়ার মওকা পায়। আর পরে, ইউরোপে বিশ্ববিদ্যালয় ও পেশাদারত্ব বিকশিত হওয়ার প্রেক্ষাপটে মোটামুটি দায়িত্বশীল কাজে নিয়োজিত যে-কারো গুরুত্বপূর্ণ লেখক হিসাবে আত্মপ্রকাশ করার সুযোগ তৈরি হয়। বিভিন্ন ডিসিপ্লিন ও পেশা সম্পর্কে জরুরি বহু বই লিখেছেন এমন ব্যক্তিরা, যাদের আলাদা করে লেখক হওয়ার অনুশীলন ও ইচ্ছা ছিল না। আর এভাবে লেখক-পাঠকের পূর্বতন অধীনতামূলক সম্পর্কের মধ্যে বিরাট পরিবর্তন আসে।
তত্ত্বতালাশ – ৭
তত্ত্বতালাশ – ৭
By (author) মোহাম্মদ আজম
বাংলাদেশ অধ্যয়ন, বেশ অনেকদিন হল, এক জরাজীর্ণ দশায় পড়েছে। নির্দিষ্ট ও একরৈখিক সত্যের চাপে তার বহুতর রোশনাই আর নতুনতর সম্ভাবনার দিকগুলো কিছুতেই চর্চার সজীব ময়দানে উন্মোচিত হতে পারছে না। নতুন সম্ভাবনাগুলো অবশ্য স্থির-নির্দিষ্ট নয়—কোনো ক্ষেত্রেই তা থাকে না। এ কারণেই চর্চার সজীব প্রবাহটা অধিকতর জরুরি; তার মধ্য দিয়েই ক্রমশ অপ্রকাশিত সম্ভাবনাগুলোর ইশারা পাওয়া যায়।
বাংলাদেশের ইতিহাসের, তা সে আর্থিক, সামাজিক, রাজনৈতিক যাই হোক না কেন, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো হয়েছে বিশ শতকের ষাট-সত্তর-আশির দশকে। অর্থাৎ, কাজগুলো প্রায় একই প্রজন্মের। মার্কসবাদী দৃষ্টিভঙ্গি কিছু কাজে ব্যবহৃত হলেও অধিকাংশ কাজ মোটের উপর জাতীয়তাবাদী ঘরানার।
ওই প্রজন্মের জন্য সেটাই স্বাভাবিক। আসলে বলা উচিত, জাতীয়তাবাদী জোশ ও টানেই অধিকাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছিল, তা কাজগুলো দেশেই হোক বা দেশের বাইরে। কিন্তু কোনো জোশই চিরস্থায়ী নয়। চর্চার ধারাটা পরের প্রজন্মে সঞ্চারিত হতে পারত কেবল প্রাতিষ্ঠানিক চর্চার অংশ হয়ে উঠলে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তা না হওয়ায় পরের দশকগুলোতে পাতে নেয়ার মতো কাজের সংখ্যা শোচনীয় মাত্রায় কমে গেছে।
তত্ত্বতালাশের বর্তমান ৭ম সংখ্যার—নানা সঙ্গত ও অসঙ্গত কারণে যে সংখ্যাটি বেরুতে বেশ কিছু বিলম্ব ঘটল—কয়েকটি লেখা প্রমাণ করছে, বাংলাদেশ-চর্চার নতুন এক পর্ব শুরু করার সময় সমাগত। বস্তুনিষ্ঠ বিবরণী অনেক কম রচিত হলেও ব্যক্তিনিষ্ঠ বিপুল রচনা এর মধ্যেই রচিত হয়েছে। প্রভাবশালী বড় কাজের সংখ্যা কম হলেও নানা এলাকায় ছোট ছোট প্রচুর কাজ হয়েছে, যেগুলো অন্য এলাকার জন্য জরুরি বিস্তর মাল-মশলা নিয়ে অপেক্ষমাণ। পত্র-পত্রিকা আর সমধর্মী নানা উপাদানের আর্কাইভ গড়ে উঠেছে বা উঠছে অনলাইন উপকরণ হিসাবে, আর সেগুলো ঘরে বসেই লেখার টেবিলে পাওয়া যাচ্ছে। ফলে তথ্য-উপাত্ত আর নানাবিধ বিবরণী হাতে পাওয়ার সম্ভাবনা এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি। আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলো কিংবা স্বাধীন গবেষকগণ সেগুলো কতটা কাজে লাগাতে পারবেন, তা-ই এখন দেখার বিষয়।
ভালো-খারাপ আর ইতি-নেতির মধ্যে আটকে যাওয়া আমাদের দেশ-অধ্যয়ন বড় ধরনের নতুন ঢেউয়ের অপেক্ষা করছে—কেবল জ্ঞানের জন্য নয়, নতুন রাজনীতিরও সেটা প্রাথমিক শর্ত।
তত্ত্বতালাশ ৩
তত্ত্বতালাশ ৩ (তৃতীয় সংখ্যা জানুয়ারি ২০২২)
By (author) মোহাম্মদ আজম
তত্ত্বতালাশ তৃতীয় সংখ্যার প্রকাশ-মুহূর্তে আমাদের লেখক-পাঠক-শুভাকাঙ্ক্ষীদের আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই।
আমাদের লেখকরা বিশেষ ধন্যবাদ প্রাপ্য। এ যুগে, শুনতে পাই, সামাজিক যোগাযোগ-মাধ্যম বিপুল লেখকের লেখার হাউস ভালোভাবেই মেটাচ্ছে। লেখকদের অন্য একটা অংশ ইংরেজিতে লিখতেই নাকি স্বস্তিবোধ করেন। এমতাবস্থায় যে ধরনের লেখালেখি ছাপবার নিয়তে আমরা এ পত্রিকা প্রকাশের উদ্যোগ নিয়েছি, তার ভাগে সামাজিক-সামষ্টিক মনোযোগে বেজায় টান পড়ছে। এ দায় এবং দায়িত্ব অবশ্য আমাদের নিজেদেরই নিতে হবে। অন্য সবকিছুর মতো লেখারও অর্থনীতি, সমাজনীতি ও মনস্তত্ত্ব আছে। কাজেই যাঁরা সামাজিক মাধ্যমে লিখে তৃপ্ত হচ্ছেন, আর যাঁরা ইংরেজি ছেড়ে বাংলা লেখাকে যথেষ্ট কাজের তৎপরতা মনে করছেন না–তাঁদের দু-দলই নিশ্চয় ওসব সূত্র মান্য করেই ভূমিকা পালন করছেন।
কিন্তু যেকোনো সূত্রের বিকল্প থাকে; এবং নতুন প্রেক্ষাপটে নতুন সূত্রও সামনে আসে। বাংলাভাষীদের কলোনিয়াল যুগে বাংলায় লেখালেখির জরুরত খুব তীব্রভাবে অনুভূত হয়েছিল। সৃষ্টিশীল লেখকদের পাশাপাশি বিপুল চিন্তাশীল-মননশীল লেখকও সেযুগে আমরা পেয়েছি। তাঁদের লেখালেখির একটা সাধারণ সূত্র লিবারেল হিউম্যানিস্ট দৃষ্টিভঙ্গিজাত–জ্ঞানে যার সামর্থ্য ও মতি আছে, সে অন্যদের জন্য লিখবে। নিশ্চয়ই নানান ব্যতিক্রম পাওয়া যাবে; কিন্তু সাধারণভাবে আধুনিক জমানায় বাংলা ভাষার চিন্তা ও মননচর্চার সামগ্রিক আয়োজনকে দুটি সাধারণ সূত্রে বিন্যস্ত করা চলে: এক. চর্চাটা প্রধানত প্রাতিষ্ঠানিক নয়, বরং ব্যক্তিগত। ভারতীয় বাংলায় এশিয়াটিক সোসাইটি, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় বা পত্র-পত্রিকার মতো প্রতিষ্ঠান শিথিলভাবে হলেও কাজ করেছিল; বাংলাদেশের বেলায় তাও বলা যাবে না। দুই. চর্চার ধরনটা মুখ্যত অনুবাদমূলক। ‘ভালো’ বা ‘উত্তম’ বলে ইতিমধ্যে প্রতিষ্ঠিত ধারণাগুলো বাংলায় উপস্থাপন করাই ছিল মূল লক্ষ্য। আমরা নিশ্চয় ভুলে যাব না, পশ্চিমায়ন ও আধুনিকায়নের একটা প্রক্রিয়া দুশ বছর ধরেই চলমান আছে, এবং তার সাথে বাংলায় লেখার প্রত্যক্ষ সম্পর্ক আছে। কিন্তু ব্যাপকতা ও গভীরতা সত্ত্বেও প্রক্রিয়াটি বোধহয় প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি পায়নি। সম্ভবত বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা, জ্ঞান-উৎপাদন, গবেষণা, জনগোষ্ঠীর সাথে সম্পর্কের প্রত্যক্ষতা ইত্যাদির দিক থেকে বাংলায় লেখালেখি খুব গভীর কোনো সিলসিলা তৈরি করতে পারে নাই। সে কারণেই কি নিউ-লিবারেল জমানার ধাক্কা আসতে-না-আসতেই বা জাতীয়তাবাদী খায়েশ দুর্বল হয়ে উঠতেই বাংলায় চিন্তামূলক লেখালেখি এতটা নগণ্য হয়ে উঠল?
বাংলাভাষী অঞ্চলে গত দুশ বছর ধরে জ্ঞানচর্চা ভালোই হয়েছে। এবং এক্ষেত্রে বাংলা ভাষার ভাগও খুব সামান্য নয়। বাংলাভাষীরা জ্ঞানচর্চায় এখনো অবদান রাখছেন। কিন্তু তার ভাগ বাংলা ভাষা আগের চেয়ে অনেক কম পাচ্ছে। গুণগত ফারাক থাকলেও এদিক থেকে ভারতীয় বাংলা এবং বাংলাদেশ অঞ্চলের অবস্থা মোটামুটি একই। প্রাত্যহিক ও সামষ্টিক জীবনের সাথে সম্পর্কিত হয়ে কাজের জিনিস হয়ে ওঠে নাই বলেই সম্ভবত এ রূপান্তর এত দ্রুত ঘটতে পেরেছে। ইংরেজি ভাষার একাডেমির নিজস্ব উৎপাদন-বিপণন-ভোগের ব্যাকরণ আছে। হয়ত একটা নয়–অনেকগুলো। এমনকি বাংলাদেশ বা ভারতীয় বাংলার স্থানীয় বিদ্যাচর্চার একাংশও সেই ব্যাকরণের বলয়েই পড়ে।
তত্ত্বতালাশ ৫
তত্ত্বতালাশ ৫ (পঞ্চম সংখ্যা, জুলাই ২০২২)
By (author) মোহাম্মদ আজম
বাংলা ভাষায় চিন্তামূলক রচনার পরিসর ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। বিশেষত একাডেমিক পরিসরে বাংলাভাষী অঞ্চলে এমন পণ্ডিতের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে, যাঁরা মনে করেন, বাংলায় বিদ্যায়তনিক রচনা অসম্ভব না হলেও দুরূহ, আর অনেক ক্ষেত্রেই অপ্রয়োজনীয়। সাধারণভাবে দুনিয়ার হালচাল এবং বাংলাভাষী অঞ্চলগুলোর রাষ্ট্রীয় সংস্কৃতির সাথে এ বাস্তবতার গভীর সম্পর্ক আছে। তত্ত্বতালাশের একাধিক সম্পাদকীয় ও প্রবন্ধে আমরা এ বিষয়ে আলোকপাত করেছি। এখানে কেবল পরিভাষা সম্পর্কে কয়েকটি মন্তব্য করতে চাই।
শাস্ত্রীয় চর্চা মূলত পরিভাষার চর্চা। এ বিষয়ে বাংলাভাষী অঞ্চলে এমনকি বিদ্বজ্জনের মধ্যেও বেশ কতকটা অস্পষ্টতা দেখা যায়। তার মধ্যে সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল, ভাষার সাথে পরিভাষাকে গুলিয়ে ফেলা। পরিভাষার যোগ ডিসিপ্লিনের সাথে, ভাষা-বিশেষের সাথে নয়। কিন্তু সাধারণভাবে আমাদের অঞ্চলে বিপরীত চিন্তাই প্রবলতর। ‘বাংলা পরিভাষা’ কথাটার জোর চল সে বাস্তবতার সাক্ষ্য বহন করছে।
উনিশ-বিশ শতকে বিশ্রুত বাঙালি পণ্ডিতগণ বাংলা পরিভাষা প্রণয়নের ব্যাপারটিকে যে এতটা গুরুতর করে তুলেছিলেন, তার কারণ অনুধাবন করা অবশ্য খুব দুরূহ নয়। কলোনিয়াল অভিজ্ঞতার কারণে এবং জ্ঞান-উৎপাদনে খুব প্রান্তীয় অবস্থানের কারণে আমাদের এখানে জ্ঞানচর্চার ব্যাপারটা বিশুদ্ধ অনুবাদমূলকতায় পর্যবসিত হয়েছিল। পশ্চিমা জ্ঞানকে বাংলায় পুনরুৎপাদিত করাই ছিল জ্ঞানচর্চার পরম লক্ষ্য। এ চর্চার নগদ ফল আমরা যথেষ্ট পেয়েছি। কিন্তু এর নানা দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির দিকও আমাদের বহন করতে হচ্ছে।
তত্ত্বতালাশ ৬
তত্ত্বতালাশ ৬ (ষষ্ঠ সংখ্যা, অক্টোবর ২০২২)
By (author) মোহাম্মদ আজম
তত্ত্বতালাশ ষষ্ঠ সংখ্যা প্রকাশিত হল, এবং তা মোটামুটি সময়ক্রম রক্ষা করে। একদিক থেকে একে সাফল্য বলা যায়; বিশেষত, উপযোগী লেখার অভাবের কারণে যথাসময়ে পত্রিকা বের করতে পারব কি না–প্রথম সংখ্যার সম্পাদকীয়তে প্রচারিত এমন আশঙ্কার কথা মনে রাখলে। পাঠক-সংখ্যার দিক থেকে বলা যায়, এ ধরনের একটা পত্রিকা সংখ্যার হিসাবে যতটা গৃহীত হবে বলে আমরা অনুমান করেছিলাম—প্রকাশক ও বিপণনকারীদের তরফে জেনেছি—তা মোটের উপর পাওয়া গেছে। পত্রিকাটির ব্যাপারে পাঠকদের কৌতূহল—ব্যক্তিগত আলাপে যতটা জেনেছি—সন্তোষজনক বলা চলে।
তবে যাকে বলা যায় সক্রিয় পাঠক, তা যথেষ্ট পাওয়া গেছে কি না, সে বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ আছে। প্রকাশিত লেখার উপর প্রতিক্রিয়া ছাপানোর ব্যাপারে প্রথম থেকেই আমাদের আগ্রহ ছিল। তা আমরা খুব একটা করতে পারিনি। ব্যক্তিগত আলাপে বা লোক-মারফতও খুব নিবিড় পাঠের খবর খুব বেশি পাইনি। এর কারণ কী হতে পারে, সে ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়া অবশ্য সহজ কাজ নয়। আপাতত আমরা পাঠকদের আগ্রহ ও কৌতূহলের উপর ভরসা রাখতে চাই।
তিন-চার সংখ্যা প্রকাশের পর থেকে বিষয়ভিত্তিক সংখ্যা করার প্রতি মনোযোগ দেব ভেবেছিলাম। প্রথম সংখ্যায় আমরা সে ঘোষণাও দিয়েছিলাম। কিন্তু বলতেই হবে, ছয় সংখ্যায় মোট যে পরিমাণ লেখকের সাথে আমাদের যোগাযোগ তৈরি হয়েছে, তার উপর ভরসা করে এ ধরনের উদ্যোগ নেয়ার সাহস আমরা পাইনি। যারা লেখার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন, তাদের হিসাবের মধ্যে আনলে সংখ্যাটা নেহায়েত কম হবে না। কিন্তু শুধু আগ্রহের ভিত্তিতে ‘কাজের’ সম্পর্ক তৈরি হয়েছে বলে ধরে নেয়া নিশ্চয়ই বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। নিজেদের পরিকল্পনা মোতাবেক লেখা পাওয়ার উচ্চাভিলাষ বাস্তবায়নের জন্য আমাদের সম্ভবত আরো বেশ কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে।
লেখক হিসাবে যাদের সাথে আমাদের কোনো যোগাযোগ প্রতিষ্ঠিত হয়নি, আমরা তাদের লেখার আহবান জানাই। জানি, কাজটা সহজ নয়। একদিকে প্রকাশের বিচিত্র মাধ্যম ও উপায় থাকায় অনেকেই হয়ত একটা বিশেষ পত্রিকার ব্যাপারে অনাগ্রহী হতে পারেন। অন্যদিকে, যে ধরনের লেখা আমরা ছাপতে চাই, তা যথেষ্ট পরিশ্রম-সাপেক্ষ; অথচ প্রাপ্তিযোগ অতি সামান্য। তবু, এমন হওয়া খুবই সম্ভব যে, কেউ একজন কোনো বক্তব্য বা ‘জ্ঞান’ প্রকাশ করতে চান, এবং পত্রিকার মেজাজ ও পরিসর বিবেচনায় তত্ত্বতালাশ সে চাওয়ার সঙ্গী হিসাবে বিবেচিত হতে পারে। এমন হলে, আমরা অনুরোধ করব, লেখার পরে বা আগেই আমাদের জানতে দিন। এমনও হতে পারে, আপনার আগ্রহ আর আমাদের আগ্রহে যথেষ্ট ঐক্য আছে।
লেখক ও পাঠকের জন্য শুভকামনা।
তত্ত্বতালাশ ৮
তত্ত্বতালাশ ৮
By (author) মোহাম্মদ আজম
তত্ত্বতালাশ প্রকাশ করতে গিয়ে আমরা আরো পরিষ্কারভাবে বাংলাদেশে বাংলা ভাষায় সিরিয়াস লেখালেখির সংকট বিষয়ে নিশ্চিত হয়েছি। আগের বিভিন্ন সম্পাদকীয়তে এ সংকটের উৎস হিসাবে আমরা প্রধানত দুটি কারণের উল্লেখ করেছি। এক. বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে বাংলায় পড়াশোনার কোনো কার্যকর বন্দোবস্ত না থাকা। দুই. নিও-লিবারেল জমানায় প্রত্যক্ষ ‘মুনাফা’ ব্যতীত কোনো পরিশ্রম করার ব্যাপারে মনস্তাত্ত্বিক অনীহা। এছাড়া সোশ্যাল মিডিয়ার প্রবল প্রতাপ, সামাজিক-রাজনৈতিক অস্থিতি ইত্যাদি তো আছেই।
আজ এ বিষয়ে অন্য এক বিবেচনার উল্লেখ করতে চাই।
সাধারণভাবে একাডেমিক লেখাপত্রে একটা পরোক্ষতা থাকে, এবং একটা কাঠামোগত ছক বা ছাঁচের মধ্যে জরুরি লেখা সম্পন্ন করা যায়। বিশেষত ইংরেজি ভাষার একাডেমিয়ার মতো বৈশ্বিক এবং কাঠামোবদ্ধ এলাকায় ব্যক্তিগত বোধ-বোধি এবং অনুভূতির বিশেষ সঞ্চার না-ঘটিয়েই এটা করা সম্ভব। বলা দরকার, ঘটনাটা ঘটে নির্দিষ্ট ডিসিপ্লিনারি একাডেমিক সমাজের মধ্যে, কোনো বিশেষ জনসমাজের সাথে সংশ্লিষ্ট না থেকেই। এ কথা বাংলা ভাষার একাডেমিক লেখাপত্রের ক্ষেত্রে অত জোর দিয়ে যে বলছি না, তার একমাত্র কারণ, এখানে আদৌ সে অর্থে একাডেমিক সমাজ প্রতিষ্ঠিতই হয়নি; কাজেই ছক বা ছাঁচেরও বেজায় গলতি আছে। তবু, কেউ যদি এমনকি কলা বা সমাজবিজ্ঞানের একাডেমিক পত্রিকাগুলোতে একবার উঁকি দিয়ে দেখেন, তাহলেই বুঝতে পারবেন, বাইরের জগতে মোটেই কল্কে পাওয়ার মতো নয়, এমন দেদার লেখা স্রেফ কাঠামোকে পুঁজি করে এসব পত্রিকায় প্রকাশিত হচ্ছে।
আমরা তত্ত্বতালাশে যে ধরনের লেখা চাই, এবং যে ধরনের লেখা প্রচুর লিখিত হওয়া দরকার বলে প্রচার করি, সেগুলোর ধরন বেশ কতকটা ভিন্ন। শাস্ত্রীয় সূক্ষ্মতা ও পরিভাষাগত সতর্কতা চাইলেও আদতে লেখায় আমরা আরো দুটো জিনিস প্রত্যাশা করি—জনগোষ্ঠীর যাপিত জীবনের প্রত্যক্ষতা এবং তত্ত্বজ্ঞানের উপলব্ধিগত সততা। এ বস্তু কাঠামোগত প্রবন্ধ-উৎপাদন-প্রক্রিয়ায় সম্ভব নয়। প্রশ্ন হল, এ ধরনের লেখার উৎপাদন, অন্তত বাংলায়, এত বিরল হয়ে উঠল কেন? দুটো কারণের কথা আগেই বলেছি। এখানে আরেকটির উল্লেখ করতে চাই, যদিও চূড়ান্ত বিচারে আগের দুটি থেকে তা পুরোপুরি আলাদা নয়।
বাংলা গদ্যে তত্ত্বচর্চার বড় প্রবাহটা শুরু হয়েছিল উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধ থেকে। এর প্রধান লক্ষণ ছিল পশ্চিমকে বাংলায় অনুবাদ করে স্থানীয় সক্ষম জনগোষ্ঠীকে শিক্ষিত করে তোলা। পুরো ব্যাপারটার সাথে অন্তত শিক্ষিত-নাগরিক জনগোষ্ঠীর যাপিত জীবনের একটা প্রত্যক্ষ সম্পর্ক ছিল, কারণ, প্রক্রিয়াটা ছিল আদতে কলোনাইজেশনের অংশ। একই সাথে এটা ‘আধুনিকায়নে’র প্রক্রিয়াও ছিল, আর সেদিক থেকে জনগোষ্ঠীকে ‘আধুনিক’ করে তোলার প্রকল্পের সাথে এর কোনো বিরোধ ছিল না।
স্থানীয় ভাষায় তত্ত্ব ও চিন্তামূলকতার চর্চার দ্বিতীয় ধাপ আমরা দেখি জাতীয়তাবাদী আন্দোলন-সংগ্রামে ও মন-মানসিকতায়—তা সে কলকাতার বাঙালি জাতীয়তাবাদ বা সর্বভারতীয় কংগ্রেসি ও পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদ, বা পরের ঢাকাকেন্দ্রিক বাঙালি জাতীয়তাবাদ—যাই হোক না কেন। জাতীয়তাবাদকে পশ্চিমা জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা বা নৈতিকতার নিরিখে বুঝতে এবং এখানে জনসংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ডে তা আমল করতে খুব একটা বেগ পেতে হয় নাই। কারণ, বিপুল জনগণের দিক থেকে তার রাজনৈতিক ও নৈতিক জরুরত ছিল।
তৃতীয় ধারাটি নিঃসন্দেহে ধ্রুপদি মার্কসবাদী ঘরানা, যেখানে পশ্চিমা জ্ঞান পার্টিলাইন ও অন্য নানাবিধ সক্রিয়তায় এক ধরনের দেশজ চর্চার ভিত্তিভূমি পেয়েছিল। লক্ষণীয়, মার্কসবাদী ধারার বাংলা তত্ত্বসাহিত্য ধ্রুপদি মার্কসবাদকে যতটা আত্তীকরণ করেছে, নব্য মার্কসবাদী স্কুলগুলোকে তার পাইর পাইও করে নাই, যদিও এসব ঘরানার বয়সও রীতিমতো শতবর্ষ হতে চলল। তবে সেটা ভিন্ন প্রসঙ্গ।
উনিশশ ষাটের দশক থেকে প্রধানত ক্রিটিক্যাল স্কুলগুলোতে এবং ভাষিক অর্থের অনির্দিষ্টতাকে ভিত্তি করে হওয়া চর্চাগুলোতে সার্বিকভাবে যে তত্ত্বকাঠামো বিকশিত হয়েছে, তার ধরন প্রায় সম্পূর্ণ ভিন্ন। খুব সরল করে এবং সংকীর্ণ করে ফেলার ঝুঁকি নিয়ে বলা যায়, আগের চর্চা ছিল অনুমোদনমূলক এবং ‘একক সত্য’-নির্ভর। পর্যালোচনামূলক এবং বহু-সত্যের দাবিদার পরবর্তী চর্চার তুলনায় পূর্বতন চর্চা খুবই আলাদা। তদুপরি, কিছু নৈরাজ্যবাদী চর্চা বাদ দিলে পরের ধাপের তত্ত্বচর্চার ভিত্তিতে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর সাথে সম্পর্কিত রাজনীতিরও খুব একটা বিকাশ ঘটেনি। আমাদের দেশে এ ধরনের চর্চা লক্ষণীয়ভাবে কম। ফলে নতুন ভাষা ও পরিভাষার বাংলাকরণ খুব একটা হয়ে ওঠেনি, যাপিত জীবনের সাথে যুক্ত হওয়া তো অনেক দূরের কথা।